কিন্তু আমাদের তিন জনের মাথায় তখন কাজ করছিল কিভাবে কুয়াকাটা যাব বাস যদি আসতে আরো দেরী করে তাহলে পৌছাতে অনেক দেরী হয়ে যাবে এবং আমাদের একটা দিন পুরুপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আবার মাথায় ভূত চাপলো লঞ্চ যাওয়ার। সিধান্ত নিলাম টিকেট এর টাকা ফেরত নিয়ে লঞ্চে যাব। কিন্তু সময় খুব কম যা করার তা খুব ফাস্ট করতে হবে নাহলে লঞ্চ ও আমাদের রেখে চলে যাবে।
কাউন্টারে গেলাম টাকা চাইলাম তারা টাকা দিতে কিছুটা অপারগতা প্রকাশ করলেও চারটা যুবক ছেলের দমকি শুনে ভয় পেয়ে এবং তাদের ভুল বুজতে পেরে আর না করতে পারল নাহ। টাকা দিতে রাজি হলো কিন্তু বলল আরেকটু দেখেন ঠিক তখন আমার ফোনে ফোন আসলো ,ফোন ধরলাম তারপর বললাম আমরা লঞ্চে যাওয়ার সিধান্ত নিয়েছি। বলার সাথে সাথে শুরু হলো লঞ্চে যাওয়া যাবে নাহ বাসে যেতে হবে। আমি বললাম সবকিছু কিন্তু কে শুনে কার কথা তার একটাই কথা লঞ্চে যাওয়া যাবে নাহ। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম তারপর মামার (শাওন) কথায় রাজি হলাম ওর বোনের বাসায় যাওয়ার জন্য। জানতে চাইছেন ফোনে যার সাথে কথা বললাম উনিকে? উনি আমার ” ই এ ” তাই আর কথা না বাড়িয়ে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম।

চিত্র : কুয়াকাটা বীচ
মামার বোনের বাসা টিকাটুলী যা সায়দাবাদ থেকে খুব বেশী দুরে না তাই হেটেই রওনা হলাম। বাসায় যাওয়ার পর ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম কার্ড খেললাম। আপু খাবার দিল ওইদিক দিয়ে মামা ফোন দিলো বাস কাউন্টারে। বাস কাউন্টার থেকে বলল বাস চলে আসছে আপনারা তাড়াতাড়ি চলে আসেন। বাস কথা শুনে আমরা না খেয়েই বেরিয়ে যেতে চাইলাম।
কিন্তু কোনভাবেই মামার (শাওন ) আব্বা , আম্মা এবং আপু আমাদের না খেয়ে যেতে দিবে নাহ। তাই বাধ্য হয়েই খেতে বসলাম। কোনরকম তাড়াহুড়া করে খেয়ে নিলাম এই ভেবে যে যদি বাস চলা শুরু করে তাহলে রাত ২-৩ টার আগে খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খাওয়া শেষে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। রাস্তায় নেমে হাটার পরিবর্তে দৌড় শুরু করলাম। মাত্র খেয়ে আসাতে বেশিক্ষণ দৌড়াতে পারলাম নাহ। তবে যতটুকু দৌড়েছি তাতেই পেটের ভাত হজম। আসার সময় পথ অনেক কম মনে হয়েছিলো কিন্তু এখন দেখি পথ আর শেষ হয় না। দৌড় -হাটা এভাবেই অবশেষে বাস কাউন্টারে পৌছালাম।
কাউন্টারে পৌছে লোকদের বাস কই জিজ্ঞাস করাতে তারা বলল বাস আসতেছে। একথা শুনে কার রাগ না উঠে? খাবারটা পর্যন্ত ঠিক মত খেতে পারলাম নাহ তাও খাবার শেষে বাস কাউন্টারে আসলাম দৌড়াতে দৌড়াতে । যাক কিছুক্ষণের মধ্যে বাস চলে আসলো , বাসে উঠে বসলাম। বাস যাত্রা শুরু করলো ১০.০৫ মিনিটে । কতক্ষণ লাগতে পারে কিছু লোক কে জিজ্ঞাস করলাম তারা বলল ১০-১১ ঘন্টা। যাক বাস তো চলা শুরু করছে তাহলে দু ঘন্টা আগে হোক আর পরে হোক কুয়াকাটা তো যাওয়া হবে। দেড় ঘন্টার মধ্যে আমরা পৌছে গেলাম মাওয়া ফেরিঘাট।

চিত্র : লাল কাঁকড়া, কুয়াকাটা বীচ
বাস থামলো , বাস থেকে আমরা চারজনই নেমে পরলাম। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলাম চারজন ই। হঠাত আমার মনে পড়ল আমরা চারজন বাসের বাহিরে আমাদের ব্যাগ গুলো বাসের ভিতরে যদি ব্যাগ গুলো কেও নিয়ে যায়। ওদের বললাম, রাজন বললো ওর ব্যাগ বাসের সিটের নিচে রেখে এসেছে ,রাসেল বলল ব্যাগ এ জামা কাপড় ছাড়া কিছু নাই তাই ব্যাগ নিলে ক্ষতি নাই ,মামা নিশ্চুপ। কিন্তু আমার ব্যাগ এ তো একটা ক্যামেরা আছে তাই আমার ব্যাগ নিয়ে গেলে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
তাই আমি চলে গেলাম বাসে। গিয়ে দেখি আমার সিটে একজন লোক বসে আছে অন্ধকারে ঠিক মত প্রথমে চিনতে পারি নাই পরে ভালো করে দেখে বুজতে পারলাম ওনি আমার পিছনের সিটের লোক। ব্যাগটা উপড় থেকে নামালাম,সিটে বসে ব্যাগটা সিটের নিচে জানালার কর্নারে রাখার চিন্তা করলাম। তখনই চোখ গেল জানালার বাহিরে দেখি একজন লোক আমাকে নিবিড়ভাবে দেখতেছে। লোকটিকে দেখে আমার সন্দেহ হলো আমিও লোকটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। লোকটি বুজতে পেরে অন্যদিকে চলে যায়। আমি তখন বুজতে পারি ব্যাগটি এখানে রাখা আরো বেশি বিপদজনক। কারণ জানালা খুলে হাত দিয়ে বাহিরে থেকেই ব্যাগ টি নিয়ে যেতে পারবে। তাই আর কিছু না ভেবে ক্যামেরা টি সঙ্গে নিয়ে নিচে নামার চিন্তা করলাম। নামার সময় পিছনের সিটের লোকটিকে বলে গেলাম ব্যাগ গুলো একটু দেইখেন।
নিচে নেমে ওদের খুজলাম না পেয়ে ফোন দিলাম। ওরা একটি নোঙ্গর করা ফেরির কাছে আমিও সেখানে গেলাম কিন্তু যেতে যেতে আমার হাত পা প্রচণ্ড শীতে ততক্ষণে বরফ। জ্যাকেট পরেই ছিলাম উপায় না দেখে ততক্ষণে হাত মোজা , কান টুপি ও পরা হয়ে গেছে। দূর থেকে দেখে আমাকে ওরা চিনতে পারেনি। পারবেই বা কি করে এইরকম ভাবে আমাকে আমি দেখলেও চিনতাম না। এক সাথে আমরা সবাই হাটলাম এদিক থেকে ঐদিকে সবকটা ফেরিঘাট ঘুরে আসলাম। প্রত্যেক টি ফেরিঘাটের পাশে এবং সারি করে রাখা বাস গুলোর মাঝখানে অসংখ্য দোকান। প্রায় সবগুলো দোকানই খাবারের দোকান। কোনটিতে পরটা -সবজি , কোনটিতে খিচুরী-গোসত, কোথাও ঝালমুড়ি, কোথাও চানাচুর বাজা।
তবে একটা জিনিস খুবই কমন সেটা হলো ইলিশ ভাজা। বড় বড় ইলিশের টুকরা রেখে দিয়েছে বলা মাত্র বেজে দিবে। গরম গরম ইলিশ বাজা এই শীতে সাথে যদি ভুনা খিচুরী পাওয়া যায় তাহলে তো কথায় নেই। তবে ইলিশ খাওয়ার আগে এইখানে একটু দরদাম করে নিতে হয়। কারণ একেক দোকানে একেক দাম যার কাছ থেকে যেমন রাখতে পারে আর কি। আমরা দাম দামী করলাম ১২০ টাকা থেকে এক টুকরো ইলিশ এর দাম নিয়ে আসলাম ৭০ টাকাতে।
এর কমে আর কোনভাবেই রাজি হয় নাহ। যাক ৭০ টাকাতেই কিনলাম , বললাম এখনি বেজে দিতে হবে। মামা এবং রাসেল ইলিশ আর গরম ভাত খাবে। গরম ভাতের সাথে ইলিশ সাথে ইলিশের তেল অনেক মজাই হবে। কিন্তু আমার যে ভূনাখিচুরী আর ইলিশ খেতে মন চাচ্ছে। রাজন ও আমার সাথে রাজী কিন্তু এই দোকানে যে ভূনা খিচুরী নেই। তবে কি আমাদের ভূনাখিচুরী খাওয়া হবে নাহ ! ঠিক করলাম ভূনাখিচুরী যেভাবেই হোক খাব। ওদের বসিয়ে আমি আর রাজন চলে গেলাম অন্য দোকান গুলো তে ভূনাখিচুরী খুজতে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বেশিক্ষণ লাগলো না খুজতে। এই দোকান থেকে ভূনাখিচুরী নিয়ে চলে গেলাম আগের দোকানে। গিয়ে দেখি মাছ বাজা প্রায় শেষ। খেতে বসব এমন সময় দেখি বাসগুলো হটাত চলা শুরু করলো। মনে হচ্ছে বাসগুলো আমাদের রেখেই চলে যাবে।
মো: মাসুদ সরকার
টুরিস্ট ডায়েরি কুয়াকাটা
